Skip to main content

ভিয়েতনাম, প্রেসিডেন্ট আর কেলেঙ্কারির গল্প (পর্ব ৪)

১৯৬৯ সাল; ২৪শে সেপ্টেম্বর। মোট আটজন বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে শুরু হল শিকাগো রায়টের ট্রায়াল। এই আটজন বিক্ষোভকারী হলেন- অ্যাবি হফম্যান, জেরি রুবিন, ডেভিড ডেলিঞ্জার, টম হেডন, রেনি ডেভিস, জন ফ্রয়নেস, লি ওয়েনার আর ববি সিল। এদের মধ্যে চার্লস গ্যারি দাঁড়িয়েছিলেন ববি সিলের হয়ে। ডিফেন্স অ্যাটর্নি হিসেবে বিক্ষোভকারীদের হয়ে দাঁড়ালেন উইলিয়াম কানস্টলার (কানস্টালারের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন Mark Rylance) আর সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল রাইটসের পক্ষ থেকে লিওনার্ড ওয়েনগ্লাস, মাইকেল কেনেডী, মাইকেল টাইগার, চার্লস গ্যারি, জেরাল্ড লেফকোর্ট এবং ডেনিস রবার্ট। প্রসিকিউটার হিসেবে ছিলেন রিচার্ড শ্যুলজ আর টম ফোর‍্যান। ট্রায়ালের বিচারক ছিলেন জুলিয়াস হফম্যান। না, অ্যাবি হফম্যানের সাথে তার কোনোরকম সম্পর্ক ছিল না মোটেই। মোট ৫৩জন সাক্ষীকে মার্কিন সরকার উপস্থিত করেছিল এই ট্রায়ালের জন্য, যার মধ্যে অ্যাবি হফম্যান আর জেরি রুবিনের আন্ডারকভার পুলিশরাও ছিল সাক্ষ্যদানের জন্য। ইতিহাসের যেকোনো বিখ্যাত ট্রায়ালগুলোর মধ্যে শিকাগো ট্রায়ালও এক ঐতিহাসিক মামলা হয়ে থেকে যাবে শুধুমাত্র এর প্রত্যেকদিনকার রোমাঞ্চকর ঘটনার জন্য। ট্রায়াল শুরুর আগে থেকে শেষ হওয়া অব্দি বিক্ষোভকারীরা কন্টেম্পট অফ কোর্ট করেছেন প্রায় ১৫৯বার। আর সেগুলো ছিল কোর্টের কাছে রীতিমতো ক্রিমিনাল অফেন্স। এমনকি ডিফেন্সের কানস্টলারকেও কন্টেম্পট অফ কোর্টের জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন বিচারক হফম্যান। ববি সিল থেকে অ্যাবি হফম্যান, জেরি রুবিনরা এই ট্রায়াল চলাকালিন প্রত্যেকদিন এমন কিছু না কিছু কান্ড ঘটাতেন যে বিচারক হফম্যান রীতিমতো আদেশ দিতে বাধ্য হতেন তাদেরকে পুলিশ কাস্টডিতে রাখার জন্য। এই ব্যাপারটা যারা “The Trial of Chicago 7” দেখেছেন, তারা দৃশ্যগুলো আরো ভালো করে মিলিয়ে নিতে পারবেন।

১৯৭০-এর জানুয়ারি মাসে র‍্যামসে ক্লার্ক যিনি ১৯৬৮-র কনভেনশানে মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে প্রেসিডেন্ট জনসনের অধীনে ছিলেন, তাকেও বিচারক হফম্যান এই ট্রায়ালে জুরিদের সামনে ডেকে পাঠান সাক্ষ্যদানের জন্য। সিনেমায় এই র‍্যামসের ভূমিকার অভিনয় করেছিলেন Michael Keaton। ট্রায়ালের আইনি জটিলতা, বিভিন্ন সাক্ষ্যদানের বিষয়কে উল্লেখ করে লেখাটাকে আর জটিল করব না। বরং সরাসরি বলে দি ট্রায়ালের অন্তিম পর্যায়ের কথা, অর্থাৎ ১৪ই ফেব্রুয়ারি যেদিন মামলা বিচারকের টেবিল থেকে জুরিদের কাছে হস্তান্তরিত হয়। মামলা জুরিদের কাছে যাওয়ার পর পরই ১৮ই ফেব্রুয়ারি জুরিরা তাদের রায় ঘোষণা করে দেয়। ফ্রয়নেস আর ওয়েনার ছাড়া জুরিরা বাকি প্রত্যেককে দাঙ্গা সৃষ্টি করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে। বিচারক হফম্যান প্রত্যেককে পাঁচ বছরের কারাদন্ড আর ৫০০০ ডলার জরিমানা ঘোষণা করে। এরপর হেডন, হফম্যানদের কি হয়েছিল; সেটা বিস্তারিত লিখতে গেলে মূল বিষয় থেকে বিচ্যূত হয়ে পড়ব। তবে “The Trial of Chicago 7”-এ এই ট্রায়ালের শেষ দৃশ্যটা বলে এই ঘটনা এখানেই শেষ করব। ট্রায়ালের অন্তিম দিন। জুরিরা তাদের রায় ঘোষণা করার জন্য অপেক্ষা করছে। জুরিদের বিচারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে মোট ৮জন মানুষ। আর তাদের দিকে চেয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক আর ফটোগ্রাফাররা। বিচারের রায় কি হতে পারে, সেটা এতিদিনের ট্রায়ালে মোটামুটি বুঝে গেছে এই আটজন। তাই যাওয়ার আগে একটা মোক্ষম উত্তর বিচারকে দিয়ে যেতে চান হেডন। রায় ঘোষণা করার আগে হেডন বিচারকের কাছে জানতে চান যে রায় ঘোষণার আগে সে কি কিছু বক্তব্য বলতে পারে আদালতের উদ্দেশ্যে। স্বভাবতই বিচারক হফম্যান হেডনকে ধীর-স্থির ও বিচক্ষণ মনে করেই তাকে সেই অনুমতিটুকু দেন। আর তারপরেই...বিচারকের অনুমতি নিয়ে হেডন কোর্টরুমকে ব্যাক্ত করতে থাকেন তার বার্তা; সেটা কিন্তু মোটেই ভিয়েতনামের যুদ্ধে আমেরিকার ব্যর্থতা নিয়ে ছিল না। তার বার্তা ছিল সেইসব মার্কিন সেনাদের নিয়ে যারা শুধুমাত্র সরকারের মদতে অন্যদেশে চালিয়ে একটা যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে শহীদ হচ্ছে প্রতিদিন। আর সেই সংখ্যাটা নেহাত কম নয়; মোট ৪৭৫২ জন। এরপর হেডন যেটা করলেন, সেটার জন্য বিচারক হফম্যান কেন, কোর্টরুমের কেউই, এমনকি তার সতীর্থরাও প্রস্তুত ছিল না। 

আসলে এই ট্রায়াল শুরু অনেক আগে থেকে, বিক্ষোভ, দাঙ্গা এসবের অনেক আগে থেকেই রেনি ডেভিস তার একটা খাতায় নোট করে রাখত ভিয়েতনাম যুদ্ধে শহীদ হওয়া প্রত্যেকটা মার্কিনবাসীর নাম। কেউ কোনোদিন সে কথা জানতে পারেনি। কিন্তু সেদিন ট্রায়ালের শেষদিনে সবাইকে চমকে দিয়ে হেডন উঠে দাঁড়িয়ে সেই ৪৭৫২ জনের প্রত্যেকটা নাম সবার উদ্দেশ্যে পড়ে শুনিয়েছিল, শুধুমাত্র তাদের আত্মার শান্তি কামনার জন্য; তাদের নূন্যতম শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। ঘটনাটা এতটাই নাড়া দিয়েছিল যে প্রসিকিউটর শ্যুলজও উঠে দাঁড়িয়েছিলেন নিরবতা পালনের জন্য। এই সিনেমায় শ্যুলজের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন Joseph Gordon-Levitt। এই আচরণে শ্যুলজের বস ফ্যোরান যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন যে সে আসলে করতে কি চাইছে; শ্যুলজ তার জবাবে দুটো বাক্য বলেছিলেন, “Showing some respect, sir….”। বাদী-বিবাদী পক্ষ আসবে যাবে এমন অনেক ট্রায়ালে, কিন্তু দেশের বীরশহীদ উদ্দেশ্যে সম্মান জানানোর জন্য যে কোনো পক্ষ-প্রতিপক্ষের দরকার পড়ে না, সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল শ্যুলজ। তবে এই ট্রায়ালের গল্প এখানেই শেষ, কারণ গল্প এবার আস্তে আস্তে ১৯৭০ থেকে ১৯৭১-এর দোরগোড়ায় এসে পৌছাচ্ছে। ক্যালেন্ডারের তারিখ বলছে তার আগের বছরের ২০ই জানুয়ারি (১৯৬৯)-এ আমেরিকার মসনদে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে চেয়ারে বসেছেন রিচার্ড নিক্সন। কিন্তু ভিয়েতনামের যুদ্ধের বিক্ষোভের বীজ যে শুধু শিকাগো ট্রায়াল ছিল না, সেটা বোঝা গেল ১৯৭১-র ওয়াশিংটন ডিসি-র এক নামজাদা সংবাদপত্র থেকে। আর এখান থেকে শুরু হল Steven Spilberg-এর পরিচালনায় Tom Hanks আর Meryl Streep অভিনীত সিনেমা “The Post”-এর গল্প, যে গল্প এক অকুতোভয় সংবাদপত্রের মালিক আর এক সম্পাদকের কথা বলে, যে গল্প এটাই বলতে চায় যে চাইলে পক্ষপাতহীন সংবাদমাধ্যম সরকার বদলে দিতে পারে।


Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...