১৯৭০-এর জানুয়ারি মাসে র্যামসে ক্লার্ক যিনি ১৯৬৮-র কনভেনশানে মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে প্রেসিডেন্ট জনসনের অধীনে ছিলেন, তাকেও বিচারক হফম্যান এই ট্রায়ালে জুরিদের সামনে ডেকে পাঠান সাক্ষ্যদানের জন্য। সিনেমায় এই র্যামসের ভূমিকার অভিনয় করেছিলেন Michael Keaton। ট্রায়ালের আইনি জটিলতা, বিভিন্ন সাক্ষ্যদানের বিষয়কে উল্লেখ করে লেখাটাকে আর জটিল করব না। বরং সরাসরি বলে দি ট্রায়ালের অন্তিম পর্যায়ের কথা, অর্থাৎ ১৪ই ফেব্রুয়ারি যেদিন মামলা বিচারকের টেবিল থেকে জুরিদের কাছে হস্তান্তরিত হয়। মামলা জুরিদের কাছে যাওয়ার পর পরই ১৮ই ফেব্রুয়ারি জুরিরা তাদের রায় ঘোষণা করে দেয়। ফ্রয়নেস আর ওয়েনার ছাড়া জুরিরা বাকি প্রত্যেককে দাঙ্গা সৃষ্টি করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে। বিচারক হফম্যান প্রত্যেককে পাঁচ বছরের কারাদন্ড আর ৫০০০ ডলার জরিমানা ঘোষণা করে। এরপর হেডন, হফম্যানদের কি হয়েছিল; সেটা বিস্তারিত লিখতে গেলে মূল বিষয় থেকে বিচ্যূত হয়ে পড়ব। তবে “The Trial of Chicago 7”-এ এই ট্রায়ালের শেষ দৃশ্যটা বলে এই ঘটনা এখানেই শেষ করব। ট্রায়ালের অন্তিম দিন। জুরিরা তাদের রায় ঘোষণা করার জন্য অপেক্ষা করছে। জুরিদের বিচারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে মোট ৮জন মানুষ। আর তাদের দিকে চেয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক আর ফটোগ্রাফাররা। বিচারের রায় কি হতে পারে, সেটা এতিদিনের ট্রায়ালে মোটামুটি বুঝে গেছে এই আটজন। তাই যাওয়ার আগে একটা মোক্ষম উত্তর বিচারকে দিয়ে যেতে চান হেডন। রায় ঘোষণা করার আগে হেডন বিচারকের কাছে জানতে চান যে রায় ঘোষণার আগে সে কি কিছু বক্তব্য বলতে পারে আদালতের উদ্দেশ্যে। স্বভাবতই বিচারক হফম্যান হেডনকে ধীর-স্থির ও বিচক্ষণ মনে করেই তাকে সেই অনুমতিটুকু দেন। আর তারপরেই...বিচারকের অনুমতি নিয়ে হেডন কোর্টরুমকে ব্যাক্ত করতে থাকেন তার বার্তা; সেটা কিন্তু মোটেই ভিয়েতনামের যুদ্ধে আমেরিকার ব্যর্থতা নিয়ে ছিল না। তার বার্তা ছিল সেইসব মার্কিন সেনাদের নিয়ে যারা শুধুমাত্র সরকারের মদতে অন্যদেশে চালিয়ে একটা যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে শহীদ হচ্ছে প্রতিদিন। আর সেই সংখ্যাটা নেহাত কম নয়; মোট ৪৭৫২ জন। এরপর হেডন যেটা করলেন, সেটার জন্য বিচারক হফম্যান কেন, কোর্টরুমের কেউই, এমনকি তার সতীর্থরাও প্রস্তুত ছিল না।
আসলে এই ট্রায়াল শুরু অনেক আগে থেকে, বিক্ষোভ, দাঙ্গা এসবের অনেক আগে থেকেই রেনি ডেভিস তার একটা খাতায় নোট করে রাখত ভিয়েতনাম যুদ্ধে শহীদ হওয়া প্রত্যেকটা মার্কিনবাসীর নাম। কেউ কোনোদিন সে কথা জানতে পারেনি। কিন্তু সেদিন ট্রায়ালের শেষদিনে সবাইকে চমকে দিয়ে হেডন উঠে দাঁড়িয়ে সেই ৪৭৫২ জনের প্রত্যেকটা নাম সবার উদ্দেশ্যে পড়ে শুনিয়েছিল, শুধুমাত্র তাদের আত্মার শান্তি কামনার জন্য; তাদের নূন্যতম শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। ঘটনাটা এতটাই নাড়া দিয়েছিল যে প্রসিকিউটর শ্যুলজও উঠে দাঁড়িয়েছিলেন নিরবতা পালনের জন্য। এই সিনেমায় শ্যুলজের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন Joseph Gordon-Levitt। এই আচরণে শ্যুলজের বস ফ্যোরান যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন যে সে আসলে করতে কি চাইছে; শ্যুলজ তার জবাবে দুটো বাক্য বলেছিলেন, “Showing some respect, sir….”। বাদী-বিবাদী পক্ষ আসবে যাবে এমন অনেক ট্রায়ালে, কিন্তু দেশের বীরশহীদ উদ্দেশ্যে সম্মান জানানোর জন্য যে কোনো পক্ষ-প্রতিপক্ষের দরকার পড়ে না, সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল শ্যুলজ। তবে এই ট্রায়ালের গল্প এখানেই শেষ, কারণ গল্প এবার আস্তে আস্তে ১৯৭০ থেকে ১৯৭১-এর দোরগোড়ায় এসে পৌছাচ্ছে। ক্যালেন্ডারের তারিখ বলছে তার আগের বছরের ২০ই জানুয়ারি (১৯৬৯)-এ আমেরিকার মসনদে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে চেয়ারে বসেছেন রিচার্ড নিক্সন। কিন্তু ভিয়েতনামের যুদ্ধের বিক্ষোভের বীজ যে শুধু শিকাগো ট্রায়াল ছিল না, সেটা বোঝা গেল ১৯৭১-র ওয়াশিংটন ডিসি-র এক নামজাদা সংবাদপত্র থেকে। আর এখান থেকে শুরু হল Steven Spilberg-এর পরিচালনায় Tom Hanks আর Meryl Streep অভিনীত সিনেমা “The Post”-এর গল্প, যে গল্প এক অকুতোভয় সংবাদপত্রের মালিক আর এক সম্পাদকের কথা বলে, যে গল্প এটাই বলতে চায় যে চাইলে পক্ষপাতহীন সংবাদমাধ্যম সরকার বদলে দিতে পারে।




Comments
Post a Comment