Skip to main content

ভিয়েতনাম, প্রেসিডেন্ট আর কেলেঙ্কারির গল্প (পর্ব ৬)



১৯৬৭-র ১৭ই জুন নাগাদ ডিফেন্স সেক্রেটারি রবার্ট ম্যাকনামারা নিজে ভিয়েতনাম স্টাডি টাস্ক ফোর্স তৈরি করেন যাদের মূল কাজটা ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ সংক্রান্ত আমেরিকার যাবতীয় পদক্ষেপ ও তথ্য লিখে রাখা; সোজা ভাষায়, তথ্য প্রমাণ তৈরি করা। আসলে ম্যাকনামারার উদ্দেশ্যে ছিল ঐতিহাসিকদের জন্য একটা প্রামাণ্য দলিল তৈরি করা যেখান থেকে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কাজে ভুল পলিসিগুলোর থেকে খুব সহজেই শিক্ষা নেওয়া যাবে। কিন্তু ম্যাকনামারা তখনও প্রত্যেকটা কাগজকে খুঁটিয়ে দেখে রেকর্ড করার কাজটা করছিলেন না। যদি তিনি খুঁটিয়ে প্রত্যেকটা কাগজকে পড়তেন, তাহলে হয়তো ‘পেন্টাগন পেপারস’ তৈরিই হত না। মোদ্দা কথা, ম্যাকনামারা স্রেফ ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন ডিফেন্সের যাবতীয় তথ্যে আর্কাইভ তৈরি করছিলেন আর সেখানে ছিল অসংখ্য যুদ্ধ সংক্রান্ত অঙ্কের হিসেব। আর এই কাগজ সংগ্রহ করার পুরো কাজটাই করছিলেন জন ম্যাকনটন, ডিফেন্স ফর ইন্টারন্যাশানাল সিক্যিউরিটি অ্যাফের্স-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি। এই ম্যাকনটনের বিশেষ সহকারী ছিলেন ড্যানিয়েল এলসবার্গ। কাজেই ‘পেন্টাগন পেপারস’-এর যাবতীয় তথ্য খুব কাছ থেকে দেখাটা ড্যানিয়েলের পক্ষে অসম্ভব কিছুই ছিল না। ১৯৬৮তে ম্যাকনামারা ডিফেন্স ডিপার্টমেন্ট ছেড়ে দেওয়ার পর তার অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করেন পরবর্তী সেক্রেটারি ক্লার্ক ক্লিফোর্ড, ১৯৬৯-এর ১৫ই জানুয়ারি। আর এর ঠিক পাঁচদিন পরেই আমেরিকার মসনদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন রিচার্ড নিক্সন। ম্যাকনামারার মতো একই ভুল ক্লিফোর্ডও করলেন; ‘পেন্টাগন পেপারস’-এর একটা পাতাও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়লেন না। দলিল তৈরির পর দেখা গেল মোট ৩০০০ পাতার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ আর ৪০০০ পাতার সরকারি অরজিনাল ডকুমেন্টস রেকর্ড হয়েছে মোট ৪৭টা ভল্যুমে। তারপর সেই ভল্যুমগুলোর উপর একটা লম্বা চওড়া নাম দিয়ে তার নিচে বড় বড় অক্ষরে লিখে দেওয়া হল- Top Secret- Sensitive। এরপর এই ৪৭ ভল্যুমের মোট ১৫টা কপি প্রকাশিত করেছিল টাস্ক ফোর্স, যার মধ্যে দুটো কপি এসে পড়েছিল র‍্যান্ড কর্পোরেশনের হাতে। আর এই দুটো কপিই এসেছিল- একজন লেস গেল্বের মাধ্যমে, পেন্টাগনে পলিসি মেকিং-এর ডিরেক্টর যাকে ম্যাকনামারা নিজে নিযুক্ত করেছিলেন। আর অন্যজন দুজন মর্টন হ্যাল্পেরিন আর পল ওয়ার্নকে-র তরফ থেকে। দুজনেই পেন্টাগনের পলিসি প্ল্যানিং-এর সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল সেসময়।

কি কি ছিল পেন্টাগন পেপারস-এ? খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে ভিয়েতনাম-মার্কিন সম্পর্ক, ফ্রেঞ্চ-ভিয়েতমিন যুদ্ধে আমেরিকার হস্তক্ষেপ, যুদ্ধের বিবরণ (যার মধ্যে পরিকল্পনা, সরাসরি আক্রমন, ‘থান্ডার প্রোগ্রাম’, দা-নাং-এ মেরিন কমব্যাট ইউনিটের প্রবেশ ইত্যাদি), আমেরিকার যুদ্ধকৌশল, এয়ারফোর্সের আক্রমণ, যুদ্ধের সপক্ষে যুক্তি, রুজভেল্ট-ট্রুম্যান-এইসেনহোয়ার-কেনেডির প্রশাসন নিয়ে যাবতীয় তথ্য। সব মিলিয়ে দেশের প্রশাসন আর স্বরাষ্ট্র বিভাগের এক জঘন্য হিসেব আর মুনফা লুঠ করার মতো পাহাড় সমান প্রমাণ। আর এতসব প্রমাণ হাতের কাছে পেয়ে ড্যানিয়েল ঠিক করলেন যে অনেক হয়েছে; এইবারে এই যুদ্ধবিরোধী আবহাওয়ায় নিজের দেশের সরকারের মুখোসটা টেনে খুলতে হবে। শুরু হল ড্যানিয়েলের কাজ।

“The Post” সিনেমায় ড্যানিয়েল এলসবার্গের ভূমিকার অভিনয় করেছিলেন Matthew Rhys। সিনেমায় দেখানো হয়েছিল যে ভিয়েতনাম থেকে দেশে ফেরার পথেই বিমানে বসে ম্যাকনামারার সাথে সৈন্যদের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন ন্যাশানাল সিক্যিউরিটি অ্যাডভাইসর রবার্ট কোমার। ম্যাকনামারা তাঁকে বারংবার বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যে দিন কে দিন তাদের সেনাদের পরিস্থিতি প্রতিকূল অবস্থায় পৌছাচ্ছে ভিয়েতনামে। ম্যাকনামারা তার নিজের সপক্ষে যুক্তি খাড়া করতে ড্যানিয়েলকেও কোমারের সামনে সত্যিটা বলার জন্য জোর করতে থাকেন। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই পেন্টাগনের প্রশাসনিক কর্তা পাত্তা দিতে চান নি সামান্য একজন পিএইচডি করা অর্থনীতিবিদের কথায়। আর এরপরেই ড্যানিয়েল বুঝতে পারেন যে ম্যাকনামারা যতই চেষ্টা করুন না কেন, তার দেশের সরকার এই যুদ্ধ থামানোর ক্ষেত্রে আদৌ কোনো আগ্রহ দেখাবে না। তাই দেশে নেমেই র‍্যান্ড থেকে যাবতীয় তথ্যের কপি তৈরি করে সেগুলোকে জনসমক্ষে ফাঁস করে দেওয়ার প্ল্যান করেন ড্যানিয়েল। তবে আসল ঘটনায় ড্যানিয়েলের ভিয়েতনাম যাওয়া, পেন্টাগন পেপারস তৈরি হওয়া, ম্যাকনামারার সাথে আলোচনা থেকে র‍্যান্ড কর্পোরেশন থেকে সেটার কপি বের করা- এর মধ্যে চার বছরের তফাৎ আছে, আসল ঘটনার থেকে আলাদা কিছুটা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, গেল্ব আর হ্যাল্পেরিন যারা পেন্টাগন পেপারস র‍্যান্ড কর্পোরেশনকে দিয়েছিলেন, তাদের সুপারিশেই ড্যানিয়েল আবার র‍্যান্ডে ফিরে আসেন। আর এবার ফিরে এসেই প্রথমেই যেটা করলেন, ‘পেন্টাগন পেপারস’-এর ৪৫টা ভল্যুমই সরিয়ে ফেললেন র‍্যান্ড কর্পোরেশন থেকে। আর এই কাজে তাঁকে সাহায্য করলেন র‍্যান্ডে তারই সহকর্মী, অ্যান্থনি রুসো।


Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...