“কৈফিয়ৎ- যাহা আজগুবি, যাহা উদ্ভট, যাহা অসম্ভব, তাহাদের লইয়াই এই পুস্তকের কারবার। ইহা খেয়াল রসের বই। সুতরাং সে রস যাঁহারা উপভোগ করিতে পারেন না, এ পুস্তক তাহাদের জন্য নহে”
উপরের লেখাটি খোদ কবিরই লেখা কৈফিয়ত, তাঁর সৃষ্ট ননসেন্স ছড়ার
সংকলনের প্রথম পাতার সূচনা এইভাবেই। অবশ্য তাঁর লেখাকে তিনি ‘ননসেন্স’ আখ্যা দিলেও
যারা সে রস উপভোগ করেছেন, তারা সেই ‘ননসেন্স’-এর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন এক ‘সেন্সবল’
জগৎ, যে জগতে ‘শিব ঠাকুরের আপন দেশে/ আইন কানুন সর্বনেশে, যে জগতে মানহানির মোকদ্দমায়
আসামী সাজিয়ে রায় দেওয়া হয় ‘তিনমাস জেল আর সাতদিনের ফাঁসি’। মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমরা
হয়তো ভাগ্যবান যে আমরা বাঙালী যারা বাংলা সাহিত্যের প্রেমে পড়েছি। সেটা না হলে হয়তো
সুকুমার রায়ের এমন খেয়াল রসের রচনাগুলোর থেকে আজীবন বঞ্চিতই থেকে যেতাম আমরা।
খুব ছোটোবেলায় মা যখন পড়ার বইয়ের পাশাপাশি বাংলা গল্পের
বই পড়ানোর অভ্যেস করালেন আমাকে, তখন হাতেখড়িটা হয়েছিল দুটো বই দিয়ে। প্রথমটা উপেন্দ্রকিশোর
রায়চৌধুরীর ‘টুনটুনির গল্প’, আর দ্বিতীয়টা হল সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’। অত ছেলেবেলায়
রচনাগুলো গভীরভাবে ভাবার মতো অবকাশ অথবা বোধ; কোনোটাই তৈরি হয়নি আমার মধ্যে। তাই দুপুরবেলা,
মায়ের হাতে ভাত খেতে খেতে যখন ‘আবোল তাবোল’-এর ছড়াগুলো শুনতাম, তখন বেশ মজার সাথে উপভোগ
করতাম কাঠবুড়ো, হুকোমুখো হ্যাংলা, ট্যাঁসগরু আর খিচুড়ির সেই অদ্ভুত জন্তুজানোয়ারদের।
এখন এত বছর পর গিয়ে উপলব্ধি করি যে তাই বাংলা
সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসাই বলি, কিংবা গল্পের বইয়ের প্রতি আগ্রহ; সেটার সাথে আমার ছোটোবেলা
থেকেই জড়িয়ে আছেন সুকুমার। কিন্তু বেড়ে ওঠার সাথে সাথে তাঁকে আরো যত চিনলাম, ততই আমার
কাছে তাঁর পরিচয়ের ব্যাপ্তি বাড়তে লাগল। তিনি যে শুধু ছড়া কেটেছেন, তা তো শুধু নয়।
তিনি ছিলেন দক্ষ একজন শিশু সাহিত্যিক যিনি তাঁর অল্প জীবনকালের মধ্যেই আমাদের জন্য
লিখে গেছেন ‘পাগলা দাশু’, ‘জজ্ঞিদাসের মামা’, ‘সবজান্তা’, ‘চালিয়াৎ’, আরোও কত কি! তিনি
ছিলেন একজন নাট্যরচয়িতা যার ভাবনা ও লেখনির গুণে পেয়েছি এক অন্য আঙ্গিকের রামায়ণ; ‘লক্ষণের
শক্তিশেল’। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ অলংকরণ শিল্পী যার রচনার সাথে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল
দ্রিঘাঞ্চু, হ্যাংলাসোরিয়াম, গোমড়াথেরিয়ামের মতো বিচিত্র সব প্রাণীর অলংকরণ। পাশাপাশি
ছিলেন একজন দক্ষ মুদ্রন কারিগরি যার প্রশিক্ষণের জন্য পৌঁছেছিলেন লন্ডন কাউন্টি কাউন্সিল
স্কুল অফ ফটোএনগ্রেভিং অ্যান্ড লিথোগ্রাফি এবং মিউনিসিপাল স্কুল অফ টেকনোলজি; যেখান
থেকে শিখে আসেন ক্রোমোলিথোগ্রাফি ও লিথোড্রয়িং। দেশে ফিরে পিতা উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যুর
পর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে চালিয়ে গেছেন শিশু সাহিত্য পত্রিকা ‘সন্দেশ’। শিশু থেকে
কিশোরবয়সীদের জন্য নিয়মিত ধাঁধা, দেশ-বিদেশের বিখ্যাত ব্যাক্তিত্বদের জীবনী, জন্তু-জানোয়ারদের
সম্পর্কে রচনা, পুরাণের গল্প; হাজির করেছেন তিনি ‘সন্দেশ’-এর পাতায়।
তবে সুকুমারের লেখনীর মধ্যে সবথেকে আচ্ছন্ন করে রাখে তাঁর উপস্থাপনা। তা সে রচনার নামকরণই হোক, কিংবা কোনো বিজ্ঞাপনই হোক! "সাড়ে ৩২ ভাজা", "মন্ডা সম্মিলনী"-র ইংরেজি তর্জমা "Monday Club", কিংবা তাঁর ড্রাফটের খাতার অদ্ভুত নামকরণ- 'এমনি খাতা', 'জাবেদা খাতা', 'ফালতু খাতা', 'খসড়া খাতা' ইত্যাদি ইত্যাদি নামকরণ হয়তো সুকুমারের পক্ষেই সম্ভব ছিল। তবে শুধু খেয়াল রসের লেখনীই তো নয়; তৎকালীন বঙ্গসমাজ, রাজনীতি, দর্শনের প্রতিও যে তাঁর যথেষ্ট দক্ষতা ও গভীরতা ছিল, সেটা জানা যায় "মন্ডা সম্মিলনী" ওরফে "Monday Club"-এর সম্পাদকীয় আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে, যে ক্লাবের প্রায় নিয়মিত সদস্য ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, অতুলপ্রসাদ সেন, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ এবং আরো অনেকে। সুকুমারের আরেকটা পরিচয় ছিল কোলকাতা ব্রাহ্ম সমাজের সাধারণ সংগঠক হিসেবে। একসময় রবীন্দ্রনাথকে ব্রাহ্মসমাজের মাননীয় সভ্য হিসেবে নির্বাচন করা নিয়ে বিবাদ শুরু হয় প্রবীণ ও নবীন সদস্যদের মধ্যে। সেসময় স্বয়ং সুকুমার ও তাঁর বন্ধু, ব্রাহ্মসমাজেরই আরেক সদস্য, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ এই বিষয়ের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে দেন যে কেন রবীন্দ্রনাথকে তাদের প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মসমাজের সদস্যদের গণভোটে সুকুমারদেরই জয় হয়।
এ এক পরম আক্ষেপের ব্যাপার যে আমরা বাঙালীরা এমন এক বহুমুখী ব্যাক্তিত্বকে মাত্র তাঁর ছত্রিশ বছর বয়স অব্দিই পেয়েছিলাম; আর তা নাহলে হয়তো আরো কিছু দাশুর কীর্তিকলাপ, আরো কিছু বিচিত্র প্রাণী ও পরিস্থিতি, এবং আরো কিছু 'ননসেন্স' সাহিত্য আমাদের প্রাপ্তি হত; যার মধ্যে নিশ্চয়ই আরো কিছু গভীর 'সেন্সবল' উপাদান পাওয়া যেতে পারত।

Comments
Post a Comment