“ধর্ম
মানুষকে আফিমের মতো নেশায় আচ্ছন্ন করে রাখে”; সাধারণত ধর্ম নিয়ে প্রসঙ্গ উঠলেই মার্কসবাদীরা
চিরকাল কার্ল মার্কসের এই উক্তিকেই আপ্তবাক্য হিসেবে আওড়ে এসেছেন। মার্কসবাদে বিশ্বাসী
অনুরাগীরা তাঁর এই বক্তব্যকে ধ্রুবসত্য হিসেবে ধরে নিলেও অ-মার্কসবাদী, ধর্মীয় নেতা,
সমাজবাদী; অর্থাৎ কিনা সেই অর্থে যারা নিজেদেরকে মার্কসবাদী বলতে নারাজ, তাদের কাছে
স্বাভাবিকভাবেই এইসব প্রশ্ন তৈরি হয়- তাহলে কি এক শ্রেণিহীন সমাজ গড়ে তোলার জন্য শ্রেণীসংগ্রামের
পাশাপাশি মার্কস ধর্মের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার কথা বলেছেন? মার্কস কি তাহলে নাস্তিকতাকে
একমাত্র সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন? শুধু অ-মার্কসবাদীরাই নন, বহু মার্কসবাদীর
কাছেও উপরের এই উক্তিটি এইভাবেই অর্থ তৈরি করে যে মার্কস তাদের সকলকে বস্তুবাদের
(materialism) পাশাপাশি নাস্তিকতা উপরে জোর দিতে বলেছেন। কিন্তু কেন মার্কস হঠাৎ এই
মন্তব্য করতে গেলেন, কোন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তিনি এমন একটা জোরালো কথা বললেন, ‘ধর্ম
এক ধরনের আফিম’; এই সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে একটু পেছনের দিকে
যে কোন সময়ে এই উক্তির জন্ম। কারণ সূচনাপর্ব পরিস্কার না হলে এই আপ্তবাক্যের দ্বান্দিক
আলোচনা সম্ভব নয়। ফিরে চলুন সেই ইতিহাসের দিকে।
ধর্মের সাথে আফিমের
সাযুজ্য নিয়ে কার্ল মার্কসের এই বক্তব্য স্থান পেয়েছিল তাঁরই লেখা ‘A Contribution
to the Critique of Hegel’s Philosophy of Right’ প্রবন্ধের একেবারে শুরুর অংশে, যেটি
পরে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয় ১৮৪৪ সালে। সরাসরি জার্মান ভাষায় লেখা আসল উক্তিটি ছিল
এরকম, “Die Religion […] ist das Opium des Volkes”, যার ইংরেজিতে আক্ষরিক অর্থ করলে
দাঁড়ায়, “Religion is the opiate of the masses”। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে
মার্কসের মাথায় ধর্ম নিয়ে এরকম একটা ভাবনার সূত্রপাত জানতে হলে ফিরে যেতে হবে মার্কসের
তরুণ বয়সে, যখন তিনি আইন পড়ার জন্য ভর্তি হলেন বার্লিনের হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সে সময়টা প্রায় গোটা জার্মানি জুড়ে হেগেলের দর্শন তত্ত্ব বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, শিক্ষিত
জার্মান তরুণদের মধ্যে তখন হেগেলের মতাদর্শের জোয়ার। মার্কসও এর ব্যাতিক্রম হলেন না,
তাঁরও পরিচয় ঘটল হেগেলের দর্শনের সাথে। হেগেলের দর্শনের মধ্যে দুটো বিষয় বেশ স্পষ্ট
ছিল- এক, আমাদের চারপাশের বাস্তব অবস্থাকে যে কোনো উপায়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, এবং দুই,
এই বাস্তব অবস্থার পরিবর্তনের সাথে আমাদের জগৎসংসারের গতিময়তার ব্যাখ্যাকে মেনে নিতে
হবে; অর্থাৎ এই জগৎ সংসারের পরিবর্তনের পেছনে কোনো ঐশ্বরিক বা অলৌকিক প্রভাব নেই। যা
ঘটছে, তা সবই বাস্তব অবস্থার প্রতিবিম্ব। এখানে শুধু হেগেলের দর্শনই নয়, স্নাতোকোত্তর
স্তরে গবেষণার সময়ে মার্কস পরিচিত হলেন গ্রীক বস্তুবাদের দুই উদ্ভাবক, ডিমোক্রিটাস
(Democritus) আর এপিকিউরাসের (Epicurus) দর্শনের সাথে।
ডিমোক্রিটাসের বক্তব্য ছিল যে
শূন্য থেকে কোনো জিনিস তৈরি হতে পারে না, তাই এই জগতের সবকিছুই সৃষ্টি হয়েছে পরমাণু
থেকে, এমনকি মানুষও। কিন্তু পরমাণুর চলাফেরা, তার গতির কোনো স্বাধীনতা নেই, সে প্রকৃতির
দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর যেহেতু মানুষও পরমাণুর থেকেই তৈরি, তাই মানুষেরও স্বাধীন ইচ্ছা
বলে কিছু নেই; তাকেও প্রকৃতি নিয়ন্ত্রন করছে। অন্যদিকে ডিমোক্রিটাসের এই পরমাণুতত্ত্বকেই
এপিকিউরাস গ্রহণ করলেও তিনি বোঝাতে চাইলেন যে পরমাণুর ইচ্ছা প্রকৃতির থেকে মানুষের
ইচ্ছা প্রকৃতিকে আলাদা করে দেখাই সবথেকে যুক্তিযুক্ত। তাঁর মতে, ‘মানুষ নিজের ইচ্ছায়
তার জীবনকে পরিচালিত করতে পারে, পরমাণু কিন্তু তা পারবে না। তাই প্রকৃতি কখনই মানুষকে
নিয়ন্ত্রন করছে না। আর সেই একই কারণে মানুষের ইচ্ছাকেও কোনো ঐশ্বরিক ক্ষমতা চালনা করছে
না’। দুই দার্শনিকের তত্ত্বের মধ্যে মার্কস এপিকিউরাসের তত্ত্বকেই সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য
বলে মনে করলেন। তারই কিছুটা সূত্র ধরে পরে মার্কস বলতে চাইলেন যে ধর্ম কিংবা ঈশ্বর
নয়, আমাদের চারপাশ অর্থাৎ বাস্তব জীবনের দর্শন থেকেই মানুষ তার ভাগ্য অথবা জীবনের গতিপথ
পরিবর্তন করতে পারে। আর এই দার্শনিক তত্ত্ব থেকেই ‘Deutsch-Französische Jahrbücher’ পত্রিকায়
প্রকাশ পেল হেগেলের অধিকারের দর্শন নিয়ে মার্কসের লেখা প্রবন্ধ (A Contribution to
the Critique of Hegel’s Philosophy of Right)। এই লেখাতেই মার্কস প্রথম দেখালেন যে
ধর্মের সমালোচনার সাথে মূলগত ধর্মের প্রসঙ্গ টেনে আনার কোনো প্রয়োজন নেই। যদি যুক্তির
সাহায্যে সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলেই ধর্মের যথার্থ সমালোচনা করা
সম্ভব। ব্যাপারটা কিরকম, সেটা পরে বুঝিয়ে বলছি। আপাতত ছাত্রাবস্থায় মার্কসসহ বাকি তরুণ
সমাজ তখন যার দর্শনের প্রতি আকর্ষিত, এপিকিউরাসের তত্ত্বের মধ্যে তাঁর তত্ত্ব কিভাবে
মার্কসকে সাহায্য করল; সেই জর্জ উইলিয়াম ফ্রেডরিখ হেগেলের পরমভাববাদ বা Absolute
Idealism সম্পর্কে কিছুটা ধারণা থাকা দরকার।

Comments
Post a Comment